অমর একুশে ফেব্রুয়ারি
রক্তে লেখা বর্ণমালা: এক ভাষাসৈনিকের নীরব আত্মকথা
Mousumi Nargis lucky |
প্রকাশ: ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০০:৩৯
একজন ভাষা সৈনিকের
ডায়েরী থেকে সংগৃহীত
কিছু স্মৃতি শব্দ হয়ে আসে না, আসে শ্বাসের মতো—ভেতর থেকে।
একুশে ফেব্রুয়ারি তেমনই একটি দিন।
সে দিন কোনো কাগজে লেখা হয়নি, লেখা হয়েছিল বুকের রক্তে;
রাষ্ট্রভাষা নয় শুধু—সেদিন বাঁচানো হয়েছিল মায়ের মুখের ভাষা।
আমি তখন তরুণ। চোখে আগুন, বুকে বাংলা।
কার্জন হলের প্রাঙ্গণে উচ্চারিত এক বাক্য আমাদের ভেতরের সব দরজা ভেঙে দিয়েছিল।
মাতৃভাষাকে অস্বীকার করা মানে আমাদের অস্তিত্বকে অস্বীকার করা—
সেই সত্য বুঝতে আমাদের এক মুহূর্তও দেরি হয়নি।
১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারি ছিল অস্থির, উত্তাল, অথচ আশ্চর্য রকম শান্ত এক দৃঢ়তায় ভরা।
১৪৪ ধারা জারি ছিল, কিন্তু আমাদের মনে কোনো নিষেধাজ্ঞা ঢুকতে পারেনি।
২১ ফেব্রুয়ারির সকাল—ঢাকা মেডিকেলের সামনে দাঁড়িয়ে।
আমরা তখন ভয় চিনতাম না, চিনতাম শুধু একটি স্লোগান—
“রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই।”
বন্দুক তাক করা ছিল আমাদের দিকে,
কিন্তু আমাদের চোখ ছিল ভবিষ্যতের দিকে।
হঠাৎ গর্জে উঠল গুলি।
রফিক, সালাম, বরকত, জব্বার—
তারা শুধু মানুষ ছিলেন না,
তারা হয়ে উঠলেন "ইতিহাসের অক্ষর।"
রাস্তায় ছড়িয়ে থাকা রক্ত দেখে
আমাদের বুকের ভেতর জমে থাকা ভয় চূর্ণ হয়ে গেল।
লাশ তুলে নিতে গিয়ে আমরা বুঝলাম—
এই লড়াই আর পিছু হটার নয়।
পরদিন গড়ে উঠল শহীদ মিনার—
ইট-পাথরে নয়, গড়া হলো শপথে।
দিনের পর দিন কেটেছে মিছিল আর পোস্টারে,
রাত কেটেছে পুলিশের তাড়ায়,
জেল, নির্যাতন, বহিষ্কার—
কিছুই আমাদের ভাষাকে থামাতে পারেনি।
কারণ এই লড়াই ছিল শব্দের নয়,
এই লড়াই ছিল আত্মার।
পরে বুঝেছি—
এটি শুধু ভাষার আন্দোলন ছিল না,
এ ছিল বাঙালির প্রথম সফল প্রতিবাদ,
যেখান থেকে জন্ম নিয়েছিল স্বাধীনতার বীজ।
একুশ আমাদের শিখিয়েছে—
নিজের ভাষায় কথা বলা মানে
নিজের মতো করে বাঁচার সাহস।
আজ যখন বাংলায় কথা বলি,
লিখি, গান গাই, স্বপ্ন দেখি—
আমি শুনতে পাই সেই দিনের প্রতিধ্বনি।
রক্তে ভেজা রাজপথ থেকে উঠে আসা এক নীরব কণ্ঠ বলে—
“ভাষা বাঁচলে মানুষ বাঁচে।”
একজন ভাষাসৈনিক হিসেবে
আমি শুধু এটুকুই জানি—
"আমরা মরিনি,
আমরা বর্ণমালায় রূপ নিয়েছি।"