ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করুন
Super Admin |
প্রকাশ: ২৮ জুলাই ২০২৫, ০৯:১০
গত ২১ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক ধর্মীয় স্বাধীনতাবিষয়ক কমিশন (ইউএসসিআইআরএফ) বাংলাদেশ বিষয়ে যে ‘তথ্যপত্র’ প্রকাশ করিয়াছে, উহাতে উক্ত বিষয়ে দেশের নাগরিক সমাজের উদ্বেগই প্রতিফলিত বলিয়া আমরা মনে করি। রবিবার সমকাল জানাইয়াছে, গত মে মাসে ইউএসসিআইআরএফ বাংলাদেশ সফর করে সেই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে উক্ত তথ্যপত্রে বাংলাদেশে আসন্ন নির্বাচনের সময় ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের উপর সহিংসতার আশঙ্কা প্রকাশ করিয়াছে। ইহার প্রভাব ধর্মীয় স্বাধীনতার ওপর পড়িবার আশঙ্কা রহিয়াছে বলিয়া তাহারা মনে করেন। তাহাদের এহেন আশঙ্কার কারণ হইল, অদ্যাবধি ‘পুলিশ মোতায়েন ব্যতীত সাম্প্রদায়িক সহিংসতা মোকাবিলায় কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা করে নাই অন্তর্বর্তী সরকার’। শুধু উহাই নহে, গত অক্টোবরে ও পরবর্তী সময়ে সংবিধানসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খাতে সংস্কারের জন্য অন্তর্বর্তী সরকার যে সকল কমিশন গঠন করিয়াছিল সেইগুলিতে যদ্রূপ ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের কোনো প্রতিনিধি রাখা হয় নাই, তদ্রূপ ফেব্রুয়ারিতে সংবিধান সংস্কারসহ ছয়টি ভিন্ন কমিশনের সুপারিশ পর্যালোচনা ও বিবেচনা করার জন্য গঠিত জাতীয় ঐকমত্য কমিশনেও উহাদের কোনো প্রতিনিধি নাই। ফলে সংবিধানের ধর্মনিরপেক্ষতাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সংশোধনী প্রস্তাব ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের অভিমত ব্যতীত গৃহীত হইতেছে। অথচ দেশের প্রায় ১০ শতাংশ মানুষ ধর্মীয় সংখ্যালঘু এবং এই সকল প্রস্তাবের সহিত তাহাদের জীবন নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত। মার্কিন এই তথ্যপত্রে হিন্দু, তৎসহিত বাংলাদেশে আদিবাসী, আহমদিয়া ও সুফি মুসলিম সম্প্রদায়ের সদস্যরাও যে বৈষম্যের শিকার হইতেছেন, তাহাও উঠিয়া আসিয়াছে। এই সকল সম্প্রদায়ের উপর বিশেষত ২০২৪ সালের আগস্টে ও তৎপরবর্তী সময়ে পরিচালিত সহিংসতার কথাও উহাতে বলা হইয়াছে।
পূর্বেই বলা হইয়াছে, উক্ত তথ্যপত্রে সংখ্যালঘু নির্যাতনের যে সকল তথ্য তুলিয়া ধরা হইয়াছে, সেইগুলি কল্পিত কিছু নহে। তবে দুর্ভাগ্যবশত, ইতোপূর্বে এই সকল অভিযোগ যখন সংখ্যালঘু সংগঠন এবং নাগরিক সমাজের পক্ষ হইতে উত্থাপিত হইয়াছিল তখন অন্তর্বর্তী সরকারের মধ্যে সেইগুলি অস্বীকারের এক প্রবণতা লক্ষ্য করা গিয়াছিল। এমনকি যদিও এই সরকার প্রায় সর্বক্ষেত্রে অতীতের সকল সরকার অপেক্ষা নিজেকে ব্যতিক্রমরূপে উপস্থাপনের চেষ্টা করে, বিশেষত সাম্প্রদায়িক সহিংসতার প্রশ্নে তাহারা বিস্ময়করভাবে অতীত সরকারগুলির উক্ত ক্ষতিকর প্রবণতা ধারণ করে। আমাদের বিশ্বাস, উক্ত মার্কিন তথ্যপত্র প্রকাশিত হইবার পর সরকার উক্ত দুঃখজনক প্রবণতা হইতে বাহির হইয়া যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগগুলির গ্রহণযোগ্য সুরাহার উদ্যোগ গ্রহণ করিবে।
যে সংবিধানের অধীনে অন্তর্বর্তী সরকার শপথ গ্রহণ করিয়াছে, তাহা এখনও কার্যকর। ভবিষ্যতে ইহাতে যে পরিবর্তনই আসুক, যতক্ষণ তাহা কার্যকর না হইবে ততক্ষণ অবধি সংবিধানটির সকল বিধানের মান্যতা প্রদানে সরকার বাধ্য।
আমরা জানি, বিদ্যমান সংবিধানের ৪১(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, (ক) প্রত্যেক নাগরিকের যে কোনো ধর্ম অবলম্বন, পালন বা প্রচারের অধিকার রহিয়াছে; (খ) প্রত্যেক ধর্মীয় সম্প্রদায় ও উপসম্প্রদায়ের নিজস্ব ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের স্থাপন, রক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার অধিকার রহিয়াছে। আর ৪১(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যোগদানকারী কোনো ব্যক্তির নিজস্ব ধর্মসংক্রান্ত না হইলে তাহাকে কোনো ধর্মীয় শিক্ষা গ্রহণ কিংবা কোনো ধর্মীয় অনুষ্ঠান বা উপাসনায় অংশগ্রহণ বা যোগদান করিতে হইবে না। এই বিধানগুলি সরকারকে কার্যকর করিতে হইবে। উপরন্তু সংবিধানের ২৮ অনুচ্ছেদে ‘ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ, বাসস্থান বা পেশাগত কারণে কোনো নাগরিকের প্রতি বৈষম্য করা যাইবে না’ বলিয়া রাষ্ট্রের প্রতি যে নির্দেশনা রহিয়াছে, তাহাও অলঙ্ঘনীয়। সর্বোপরি একটা অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র ও সমাজ গঠনের যে অঙ্গীকার গণঅভ্যুত্থানের নেতৃবৃন্দ করিয়াছেন, তাহা নিশ্চয়ই ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের বাদ দিয়া করা যাইবে না। উহারই প্রতিফলন হিসাবে সংবিধানের মূলনীতিতে ‘বহুত্ববাদ’ শব্দটা যুক্ত করিবার প্রস্তাব উঠিয়াছে বলিয়া আমাদের বিশ্বাস। আর সেই বিশ্বাসকে যথাযথ মর্যাদাদানের জন্যও অবিলম্বে ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করিবার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা অন্তর্বর্তী সরকারের অবশ্য কর্তব্য বলিয়া আমরা মনে করি।