নির্বাচনেই হোক জনসমর্থনের পরীক্ষা
Super Admin |
প্রকাশ: ২৮ জুলাই ২০২৫, ০৯:০৯
গণঅভ্যুত্থানে অবধারিতভাবেই ঘটেছে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন কর্তৃত্ববাদী শাসনের অবসান। তাঁর দলের ‘কার্যক্রম’ও নিষিদ্ধ করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। এই সরকার এসেছে গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারীদের অনুমোদনে। প্রত্যাশা, জরুরি কাজগুলো সম্পন্ন করে সরকার দেশকে নিয়ে যাবে গণতন্ত্রে।
গণঅভ্যুত্থানের পরপরই তিন মাসের মধ্যে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের একটি দাবি উঠেছিল। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মাধ্যমে উল্লিখিত সময়ের মধ্যে নির্বাচন আয়োজনের তিনটি ঘটনা নিকট অভিজ্ঞতাতেই রয়েছে। তা সত্ত্বেও দাবিটি গুরুত্ব পায়নি অন্তর্বর্তী সরকার ও অপরাপর দলের কাছে। পরিবর্তিত পরিস্থিতি বিবেচনা করে দাবি উত্থাপনকারীরাও সেটা মেনে নেন। তাতে গুরুত্ব পায় গণঅভ্যুত্থানে হতাহতদের বিষয়টি দেখার প্রশ্ন; বিচার ও সংস্কার এগিয়ে নেওয়ার দাবি।
এর মধ্যে পরিস্থিতি ঘোলাটে হয় আইনশৃঙ্খলা ভেঙে পড়ায়। বিভিন্ন ‘বঞ্চিত জনগোষ্ঠী’ নেমে পড়ে রাস্তায়। শক্তিশালী প্রতিবেশী দেশের সরকার গণঅভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়াতেও পরিস্থিতি কঠিন হয়ে পড়ে। দেশের একাংশে আঘাত হানে বন্যা। পণ্যবাজারে লাগে এর ধাক্কা। সরকার অবশ্য বাজার সামাল দিয়েই চলেছে। তবে মব ভায়োলেন্স সামলাতে ব্যর্থ। পরাজিত পক্ষ নিশ্চয়ই মব করছে না। এর দায় অন্যদেরই নিতে হবে। আর এটা বন্ধ করতে না পারার দায় সরকারের।
তৃণমূল পর্যন্ত নতুন নামে চাঁদাবাজি চলছে বলেও অভিযোগ। চাঁদার হার বৃদ্ধির কথা শোনা যাচ্ছে। অতি সম্প্রতি বিএনপি মহাসচিব জানালেন এক লাখ টাকার ঘুষ পাঁচ লাখ হওয়ার কথা। এ জন্য আর ক্ষমতাচ্যুতদের দায়ী করা যাবে না। এখন যারা রাষ্ট্রক্ষমতায়, তাদের ভূমিকাই লক্ষ্য করবে জনগণ। প্রশাসনে প্রভাব বিস্তার করে কারা কী করছে, তার খবরও কম ফাঁস হচ্ছে না। হাটবাজারে চাঁদাবাজি অবশ্য হচ্ছে প্রকাশ্যেই। এটা ঘিরে রক্তারক্তিও হচ্ছে। এসব রোধের দায়িত্ব যে সরকারই ক্ষমতায় থাকুক, তার।
অতীতে কোনো অন্তর্বর্তীকালেই এমনটি দেখা যায়নি। ওয়ান-ইলেভেন সরকারও প্রায় দু’বছর দেশ চালিয়েছে। তখন আইনশৃঙ্খলার উন্নতি ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোরতা ছিল দৃশ্যমান। জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী পর্বটা অবশ্য ভিন্ন। সে জন্য জরুরি ছিল সরকারের আরও কঠোর ভূমিকা। মাঠে থাকা সব দল শুধু নয়; সেনাবাহিনীও কিন্তু তার পাশে রয়েছে। গণঅভ্যুত্থানের কিছুদিন পরই সেনাপ্রধান বলেছিলেন, ১৮ মাসের মধ্যে সংস্কার ও নির্বাচন অনুষ্ঠানে যে কোনো পরিস্থিতিতে সরকারকে সহায়তা জোগাতে তারা প্রস্তুত। অতঃপর এক বছর হতে চললেও নির্বাচন তো দূর; সংস্কারেও অগ্রগতি সামান্য। সংস্কার আলোচনা কেবল দৃশ্যমান। এর ভিত্তিতে ‘জুলাই সনদ’ তৈরির মধ্য দিয়ে নির্বাচনের সময়সীমা নাকি চূড়ান্ত হবে।
নির্বাচন এখনও শর্তসাপেক্ষ! এবার এর নিঃশর্ত ঘোষণা আসে কিনা, দেখতে হবে। নির্বাচনের মাধ্যমে কী অর্জিত হবে, তা নিয়ে অবশ্য তর্ক করেন অনেকে। নজিরবিহীন গণঅভ্যুত্থানে প্রত্যাশা অনেক বেড়ে যাওয়ায় অন্তর্বর্তী সরকারের মাধ্যমেও অনেক কিছু অর্জনের চেষ্টা বেড়েছে। ‘মৌলিক সংস্কার’-এর ওপর জোর দিচ্ছে সরকারও। এর বাইরে যেসব সংস্কারে আলোচনার প্রয়োজন নেই, তার বাস্তবায়নে আবার হেলদোল নেই সরকারের মধ্যে। উদাহরণস্বরূপ, পুলিশে কোনো সংস্কার না হওয়ার কথা তোলা যায়। পুলিশ কাজে ফিরলেও প্রত্যয়ের সঙ্গে কাজ করতে পারছে না। এদিকে মাঠে সেনাবাহিনী থাকলেও পুলিশি দায়িত্ব পালনে হিমশিম খাচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে শক্তি প্রয়োগ করতে গিয়ে হচ্ছে বিতর্কিত। মাঝে সেনাবাহিনীর সঙ্গে সরকারের দূরত্বও স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। মাঠে থাকা প্রধান রাজনৈতিক দলের সঙ্গেও সরকারের দূরত্ব স্পষ্ট। এ অবস্থায় কাদের সঙ্গে তার নৈকট্য বেড়েছে, সেটা অস্পষ্ট নয়। গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দানকারীদের একাংশ সরকারে যোগ দিয়েছিল। তাতে শুরুতে দৃশ্যত আপত্তি না উঠলেও পরে বেড়েছে। তারা রাজনৈতিক দল গঠনে উদ্যোগী হলে আপত্তি হয় তীব্র। সরকারে থেকে মাঠের একটি দলকে তারা পৃষ্ঠপোষকতা জোগাচ্ছেন বলে অভিযোগ তো গুরুতর।
অন্তর্বর্তী সরকারের ‘রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা’ বিনষ্টের অভিযোগটি ইতোমধ্যে জোরালো। তারা একটি পক্ষের দিকে হেলে আছেন বলে বক্তব্য প্রকাশ্যেই দেওয়া হচ্ছে। গণঅভ্যুত্থানে হাসিনা সরকারের পতনকে দেশের সিংহভাগ মানুষ স্বাগত জানালেও এতে অতিউৎসাহী হয়ে ওঠা একটি শক্তির কর্মকাণ্ড তাদের ব্যথিত করেছে। ওই শক্তির বিষয়ে সরকারের নির্লিপ্ততা নিয়ে প্রশ্নও উঠেছে অনেক। এর সদুত্তর মেলেনি। মুখে না বলে কাজেও সদুত্তর দেওয়া যায়। উপযুক্ত কাজ না করে অপ্রত্যাশিত বিষয়ে আগ্রহ দেখালে আবার প্রশ্ন ওঠে সরকারের উদ্দেশ্য নিয়ে। তেমন প্রশ্ন ওঠার সুযোগও তৈরি হয়েছে।
গণঅভ্যুত্থানে কার কী ভূমিকা– তা দিয়ে সামনে কারা দেশ চালাবে, সেটা নির্ণীত হবে না। জনগণ এটা নির্ধারণ করবে নির্বাচনে। গণঅভ্যুত্থানে যারা সবচেয়ে বেশি উৎসাহিত, তাদের নিয়ে দেশের মানুষের উৎসাহ নির্বাচন হলেই বোঝা যাবে। কিন্তু নির্বাচনে তাদের আগ্রহ পরিলক্ষিত হচ্ছে না। সরকারকেও ‘অন্যান্য বিষয়ে’ বেশি আগ্রহী মনে হচ্ছে। সহজে বাস্তবায়নযোগ্য সংস্কারে না যাওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে সংস্কার আলোচনায় কালক্ষেপণের অভিযোগও উঠছে। সরকার কার্যত কার এজেন্ডা বাস্তবায়নে নিয়োজিত– সে প্রশ্নও উঠছে অবধারিতভাবে।